"বয়স তো কম হল না, নষ্টামিটা এবার না হয় বন্ধ করো।"
সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে প্রচন্ড উত্তেজিত হয় পাইচারি করতে লাগলো সমীরণ।শীতের সকাল, রাত ভোর ঘুম না হওয়া সুজাতার চোখ দুটো বেশ ফোলা ফোলা,এলোমেলো চুল, পরনের নাইটি টাও কাঁধের দিক থেকে অনেকটা ছিঁড়ে গেছে ,
খাটের এক কোনে হাত পা ছড়িয়ে হতবাকের মতো বসে আছে সে , তার জল ভরা রক্তাভ চোখ দিয়ে একবার সমীরণের দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো,
সমীরণের এই সব মারধোর সুজাতার কাছে নতুন নয় তবে প্রতিদিনের মতো আজ আর সে নিজেকে ঠিক প্রমাণিত করার ব্যাক খুঁজে পেলো না।বেশ কয়েক বছর হলো সুজাতার কান্নার অভ্যাসটা ছেড়ে গেছে এসবে তার আর কোন লজ্জা রাগ ভয় অভিমান কিছুই হয় না, আসলে কোন একই কাজ কোন এক ব্যক্তির সাথে নিয়মিত হতে থাকলে সেই কাজের প্রতি সেই ব্যক্তির আগ্রহ বা ভয় কোনটাই থাকে না বরং বিষয়টির প্রতি সে অভ্যস্ত অথবা বিরক্ত হয়ে ওঠে। সুজাতা ও তাই ,তবে সে কতটা বিরক্ত হয়ে পড়েছিল তা না জানলেও এটি সম্পূর্ণ রূপে বোঝা যেত সে এসব বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল তার চোখ থেকে অনর্গল জল দেখ সমীরণ চোখ বড় বড় করে নাক কুঁচকে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল
" ন্যাকামি করো না তো আমার এসব পোষায় না,"
সুজাতা আবারও চোখে জল নিয়ে চোখ বড় বড় করে সমীরণের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলে উঠলো
"মেরে ফেললে ওদের মেরে ফেললে!"
সঙ্গে সঙ্গে সমীরণ খাটে উঠে সুজাতার গাল খাটের কোনের দেওয়ালে ঠুসে ধরে বলল
" কি বলছিস? কি বলছিস তুই ?পাগলামি? তোর পাগলামি এক্কেবারে ঘুচিয়ে দেবো ,
তোদের মতোন মেয়ে ছেলে গুলিকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি, এসবের পেছনে পরকীয়া টা বেশ ভালোই চলছে বল!"
আরও শক্ত করে ঠুসে ধরে বলল," এই বল কে ,কে, মাল টা কে ? কি মতলব বলতো তো তোর?এ সব পিরিত মাখানো কথা কোথা থেকে আসছে তোর ?শালি সন্তান দেবার মুরোদ নেই, পরকীয়া চালাছে!এখন তো আবার আইনের ছাড়পত্রটাও পেয়ে গেছিস তোরা, শোন এখানে এ সব চলবে না, সব পুড়িয়ে দেবো ,তোকেও, ধ্যামনামো হচ্ছে !"
সুজাতা এক ধাক্কায় সমীরণ কে সরিয়ে দিয়ে চোখ টা বন্ধ করে রাখে, তার বন্ধ চোখ বেয়ে অঝরে বইতে থাকে বুক ভাঙা রক্তের মতো জল তার আর নিজের বলে কিচ্ছু নেই কোন পিছুটান নেই সে আজ সম্পূর্ণ নিঃস্ব!
ধাক্কা খেয়ে সমীরণ আবার ও নির্লজ্জের মতো সুজাতা উপর চড়াও হতে যাচ্ছিলো তক্ষুনি সমীরণের মা দরজার দোরগোড়ায় হাঁপাতে হাঁপাতে এসে কাঁদো কাঁদো স্বরে সুজাতার উদ্দেশ্য বললেন ,
"আর জ্বালিয়ো না গো মা আর জ্বালিয়ো না, খুব খাটা খাটনি করে ছেলেটা আমার, আয় রে বাবা ওই রকম করিস না।"
সমীরণ আর তার মায়ের এই আদিখ্যেতা সুজাতার যে খুব একটা অপরিচিত তা নয়, দশ বছরের বিবাহিত জীবনে সে এমনটা বহুবার দেখেছে তবুও আজ যেন এই সব তার কাছে আগুনের মত মনে হচ্ছে পুড়িয়ে দিচ্ছে তার সমস্ত শরীরটাকে, তার শুকিয়ে যাওয়া চোখের জল আজ আর কিছুতেই বাঁধ মানছে না, সন্তান হারানো বিধ্বস্ত পাগলী মায়ের মতে সে খাট থেকে নেমে ঘরের বাইরের উনুন টার কাছে গিয়ে ধপ করে বসে পড়লো আর উনুন টার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল,
গত কাল রাত তখন একটা হবে, সমীরণ মদ খেয়ে পরনের শার্ট প্যান্টে শুকনো মাটির দাগ লাগিয়ে শার্টের বুক পকেটে টা ছেঁড়া অবস্থায় বাড়ি ফিরেছে,সুজাতা দৌড়ে আসতেই সমীরণ চিৎকার করে তাকে গালিগালাজ করতে থাকে, সমীরণের হাতে একটা দোমড়ানো মোচড়ানো ম্যাগাজিন,তার খুব অন্তরঙ্গ বন্ধুরা তাকে আজ বেশ কিছু কথা শুনিয়েছে,
"ভাআআই তোমার বউ এর তো রস কম নেই,উফফফ কি পড়লাম গুরু, আমরা পড়েই আর থাকতে পারছি না আর গুরু তুমি তো ..... কি জোগাড় করেছো মায়রি!এই সব মাল গুলি পড়াশোনা করে না, আমি তাই সবাই কে পড়ে শুনলাম আমাদের সুজাতা বউদি।"
বেশ কিছুদিন আগে সুজাতা খুব খুশি হয় সমীরণ কে বলে ছিল
" জানো আমার একটা লেখা কাগজে ছেপেছে,প্লিজ পড়ো,ওটা আমার সন্তান আর আমাদের সবচেয়ে সুন্দর মূহুর্ত।"
সমীরণ বিষয়টাকে গুরুত্ব দেওয়া তো দুরের কথা সুজাতার পাগলামি বলে উড়িয়ে দেয়।বাপ মা হারা মেয়েটা বিয়ের পর এই সংসার জীবনের সাথে আত্মস্থ নাহলেও বেশ ধাতস্থ হয়ে গিয়েছিল, দশ বছরের সংসার জীবনে সন্তান না পাওয়ার শোক তাকে প্রায় পাগলের মত করে তোলে,ছোট বেলা থেকে সুজাতা পড়াশোনাতে বেশ ভালোই ছিল লেখালেখিটা ছিল তার একপ্রকার নেশা, সকলের অজান্তে সে কবিতা লিখতো আর লুকিয়ে রাখতো। কিন্তু বিয়ের পর বেশ কয়েকবার সন্তান হারানো যাতনা তার এই নেশা টিকে সন্তান সমতুল্য করে তোলে। ছোট থেকে ছোট্ট ঘটনাও সে লিখে রাখে তার এই সব খাতার পাতায় পাতায় আর সে সব বুকে আঁকড়ে ধরে বলে,
"এই তো, এই তো আমার সন্তান, রক্ত মাংসহীন আমার বিনায়ক।"
সমীরণের এই সব পাগলামি বলে মনে হয় ।
পাশের বাড়ির রিটায়ার্ড বৃদ্ধ শিক্ষক রফিক শেখ সুজাতা কে বড় ভালো বাসতেন স্ত্রী বিয়োগের পর তাকে তার একমাত্র সন্তান দেখাশুনা করে না, সুজাতা তাকে জ্যাঠামশাই বলে সম্বোধন করত এবং ঘরের কাজ শেষ করে মাঝে মাঝেই জ্যাঠা মশাই এর কাছে যেতো বই এর লোভে, জ্যাঠা মশাই জানতেন সুজাতা লেখালেখি করে। তাই তিনি সুজাতা কে এই পত্রিকাটির ঠিকানা দিয়েছিলেন সুজাতা সেখানে প্রথম লেখা পাঠায়,
সমীরণ গতকাল রাতে খুব উত্তেজিত হয়ে সুজাতার সাথে ধস্তাধস্তি করে তার সমস্ত বই খাতা লেখা কেড়ে নিয়ে পুড়িয়ে দেয় দশ বছর সংসার জীবনের লুকিয়ে রাখা খাতা কলমের সন্তান আর তার সম্পূর্ণ একার পৃথিবীটা এক মূহুর্ত মধ্যে তার চোখের সামনে পুড়ে ছাড়খার হয়ে যায়।
হঠাৎই উনুনের সামনে বসে থাকা সুজাতা মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ে যায় শব্দ শুনে সমীরণ ও তার মা ছুটে এলে দেখে সুজাতার মুখ থেকে গ্যাজা বেরচ্ছে তার বাঁ হাতে কীটনাশকের বোতল আর ডান হাতে অর্ধেক পোড়া একটা কাগজ যাতে লেখা
"আমার সন্তান দের দেহ জুড়ে বয়ে চলেছে আমার সকল অনুভূতি, আমি অক্ষম নই, আমিও একজন মা।"
